মাদকের অভয়ারণ্য কীর্তনখোলার তীরে রসুলপুর বস্তি

বরিশালের কীর্তখোলা নদীর কোল ঘেঁষে বহু বছর আগে গড়ে উঠেছে রসুলপুর বস্তি। এই বস্তি সবচেয়ে বড় মাদকের স্পট বলে চিহ্নিত। বরিশাল সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওতাধীন এই বস্তিতে বর্তমানে ১২০০ থেকে ১৩০০ লোকের বসবাস। খেয়া পারাপারের মাধ্যমে যাতায়াত করতে হয়। যাতায়াত মাধ্যম সহজ না হওয়ায় এখানে গড়ে ওঠেছে মাদকের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শহরের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের চালান পাচার হচ্ছে। স্থানীয়রা জানায়, এই চক্রের সদস্যরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বেশিরভাগ সময়ে লেনদেন করে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি না থাকায় বস্তিটি এখন মাদকের আখড়ায় পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রসুলপুর বস্তিতে মাদকের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে লিপি ও পলাশ। এরা দু’জন স্বামী-স্ত্রী। সম্প্রতি ইয়াবাসহ পলাশ ডিবি পুলিশের জালে ধরা পড়ে। বর্তমানে তিনি কারাগারে। কিন্তু থেমে নেই তাদের মাদক বেচাকেনা। বস্তি থেকে শুরু করে নগররের আশপাশ এলাকায় ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল সরবরাহ করছে মাদক সম্রাজ্ঞী হিসেবে পরিচিত লিপি। তার নেতৃত্বে এই এলাকায় মনির, কালু, খুকু, নাসির, জসিম, কমলা সহ প্রায় ৩০-৪০ জন মাদক ব্যবসায়ী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বীরদর্পে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায়ও এদের নাম রয়েছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী খুব বেশি তৎপর নয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চা বিক্রেতা জানান, বস্তির মাদকের নেত্রী হিসেবে লিপি পরিচিত। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে ইয়াবা ও গাঁজাসহ অনেক রকমের মাদক বেচা কেনা হয়। এদের অনেক সোর্স রয়েছে। কথা বললে তাদের নেত্রীর কাছে খবর চলে যায়। তাই ভয়ে মুখ খুলতে সাহস করে না কেউ। তাদের বিরোধিতা করলে আমাগোও মাদক দিয়ে ধরাইয়া দিবে লিপি। তিনি বলেন, প্রশাসনের লোক দেখি এসে ঘুরেফিরে আবার চলে যায়। কাউরে কিছু বলে না।
নগরের অন্যতম স্পট- ১১ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদমারী বস্তি। সেখানে প্রধান হচ্ছে ভুলু রাব্বি, কালা মনির, রুবেল, রাব্বি, বাপ্পি, ফোরকান ও রনি। এরা ইয়াবা, গাঁজা বিক্রি করছে। কেডিসি বস্তিতে অবাধে মাদক বিক্রি করছে ইমন, টিটু, কাজল, সুজনসহ আরো বেশ কয়েকজন। পলামপুর ও মহাম্মদপুর বস্তিতে মাদকের প্রধান হচ্ছে মান্না ও সুমন। তাদের নেতৃত্বে ঐ দুই বস্তিতে অর্ধশতাধিক মাদক ব্যবসায়ি রয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম মিরাজ, শিউলি ও নাসির।
এদিকে নগরীর বিভিন্ন অলিগলিতে জমজমাট মাদক বাণিজ্যের মধ্যে অন্যতম নাজিরের পুল। সেখানকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ব্যস্ততম সড়কের এই পুলে দাঁড়িয়ে প্রতিদিনই বিক্রি হয় গাঁজা, ইয়াবা ও ফেনসিডিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালালেও এই পুলের ওপর তারা যায় না। আশপাশের এলাকায় গিয়ে মাদক ক্রেতাদের আটক করা হয়। তাই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে মাদক কারবারিরা।
নগরের নাজিরপোল, ব্যাপটিস্ট মিশন, রিফিউজি কলোনি, মড়ক খোলার পুল, কাশিপুর বাজার, স্টেডিয়াম সংলগ্ন বস্তি, মেডিকেলের পেছনের বস্তি ও রূপাতলীসহ অন্তত ৪৮টি স্পটে প্রতিদিন চলে মাদক কেনাবেচা।
বিভিন্ন মাদকবিরোধী সংগঠনের সংগঠক ও স্বেচ্ছাসেবকরা জানান, বরিশালে বিভিন্ন নদীকে মাদকের রুট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে সহজেই তরুণদের হাতে মাদক পৌঁছায়। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী আন্তরিক হলে এসব বন্ধ করা সম্ভব।
বরিশাল মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর গোয়েন্দা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এনায়েত হোসেন বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা সব সময় সচেতন আছি। মাদক নিয়ে ধরা পড়লে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছি। মাদক কারবারিও আটক হচ্ছে অনেক। কিন্তু জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তারা আবার মাদকের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। তবে আমরা এসবের বিরুদ্ধে সব সময় সতর্ক আছি।
নগর পুলিশ গত এক বছরে মাদকের মামলা করেছে ৮৭৭টি। গ্রেফতার হয়েছে ১২১১ জন। অন্যদিকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর গ্রেফতার করেছে ১৫২ জন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে। মামলা হয়েছে ১০৮টি।
এইচকেআর