ডাস্টবিন দখল করে আ’লীগ কার্যালয়, আবর্জনা ফেলা হচ্ছে খেলার মাঠে

বরিশাল সিটি করপোরেশনের স্বল্প আয়তনের ১৬ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ড। আয়তনে ছোট হলেও ওয়ার্ড দুটি ঘিরে আছে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা এবং স্কুল-কলেজ। ওয়ার্ড দুটিতে গত পাঁচ বছরে সড়ক এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও কমেনি অপরাধ ও অব্যবস্থাপনা।
১৬ নম্বর ওয়ার্ডটিতে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন না থাকায় একমাত্র খেলার মাঠটি পরিণত হচ্ছে ময়লার ভাগাড়ে। এর আগে সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিনটি পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ে।
অপরদিকে, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডবাসীর আতঙ্ক অপসো স্যালাইন কারখানা। যেটি স্থানান্তরের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর দফায় দফায় নোটিশ দিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। তাছাড়া সরকারি মহিলা কলেজ এবং সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ঘিরে কিশোর অপরাধী এবং ইভটিজারদের দৌরাত্ম্যের কারণে আতঙ্কে থাকতে হয় ওয়ার্ডবাসীকে।
তবে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের টানা তিনবারের নির্বাচিত কাউন্সিলর আকতার উজ্জামান গাজী হিরু। অন্যদিকে ডাস্টবিন দখল করে দলীয় কার্যালয় নির্মাণের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাজিব হোসেন খান।
জানা গেছে, ‘নগরীর আলেকান্দা সড়কের পূর্বপাশ, পশ্চিম সদর রোড, ব্রাউন কম্পাউন্ড, দক্ষিণ ঈশ্বর বসু রোড এবং গোড়াচাঁদ দাস রোড নিয়ে গঠিত ১৬ নম্বর ওয়ার্ড। ১ বর্গ কিলোমিটারের এই ওয়ার্ডটিতে ভোটার সংখ্যা ৫ হাজার ৪৪৬ জন।
অপরদিকে, ০ দশমিক ৯১ বর্গ কিলোমিটারের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে মোট ভোটার ৫ হাজার ৪০৫ জন। উত্তর ঈশ্বও বসু রোড, দীনবন্ধু সেন রোড, পূর্ব বগুড়া রোড, পেশকার বাড়ি, পূর্ব মল্লিক রোড, অনামী লেন, আগরপুর রোড, দক্ষিণ কালিবাড়ি রোড, ফকির বাড়ি, ক্লাব রোড, রাখালবাবু সড়ক এবং মধ্য ও পশ্চিম সদর রোড নিয়ে গঠিত এই ওয়ার্ডটি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ‘বগুড়া রোডের বিশাল এলাকাজুড়ে আছে অপসো স্যালাইন কারখানা। স্যালাইন কারখানার ধোয়া ছড়িয়ে পড়ছে নগরীর আকাশে। ব্যবহার করা হচ্ছে বয়লার মেশিন। শহরের মধ্যে এ ধরনের যন্ত্রের ব্যবহারে দুর্ঘটনা ঘটলে বড় আকারের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, ‘২০১৩ সাল থেকে কয়েক দফায় অপসো স্যালাইন লিমিটেড নগরীর জনবহুল এলাকা থেকে স্থানান্তরের জন্য নোটিশ দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে তাদের নোটিশের জবাব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। বহু বছরের পুরানো এই দপ্তরটি স্থানান্তর সম্ভব নয় বলে তারা জানিয়ে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তরকে। কিন্তু পরবর্তী ১০ বছরেও এ প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি পরিবেশ দপ্তর।
অপরদিকে, বগুড়া রোড, আগরপুর রোড, ক্লাব রোড, ফকিরবাড়ি রোডের একাধিক বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভালো উন্নয়ন হয়েছে। তবে ওয়ার্ডের বড় সমস্যা হচ্ছে কিশোর অপরাধী এবং ইভটিজার।
তারা অভিযোগ করেছেন, ‘বগুড়া রোডের চিহ্নিত এবং পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, ওয়ার্ড বিএনপির সদস্য সচিব আরমান সিকদার নুন্নার নেতৃত্বে একাধিক কিশোর অপরাধী গ্রুপ গড়ে উঠেছে। কিছুদিন আগেও বগুড়া রোডে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ওপর সশস্ত্র হামলা করেছে নুন্না ও তার বাহিনী। এই ঘটনায় মামলা হলেও তাকে গ্রেফতার করেনি পুলিশ।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেছেন, ‘সন্ত্রাসী নুন্না’র ছোট ভাই সলাউদ্দিন সিকদার নিজেকে কথিত সাংবাদিক দাবি করে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এ কারণেই বড় অপরাধ এবং তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হয়েও গ্রেফতার হচ্ছে না নুন্না।
তাছাড়া সালাউদ্দিন ও একই এলাকার বাবুর্চি নাজেমের ছেলে রেজা কিশোর অপরাধী এবং নুন্নার পৃষ্ঠপোষক।
আর এসব অপরাধী চক্রকে আইনি সহায়তা দিয়ে থাকেন একই এলাকার বিতর্কিত এবং বহিস্কৃত এক আওয়ামী লীগ নেতা। সম্প্রতি নুন্না বাহিনীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় রেজাসহ যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের জামিনের বিষয়েও সহযোগিতায় ছিলেন এই আইনজীবী।
স্থানীয়রা বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল-বিকাল মেয়েদের স্কুল এবং কলেজের সামনে আড্ডা জমছে কিশোর কিশোর অপরাধীদের। তারা নানাভাবে উত্ত্যক্ত করছে তাদের। কিছুদিন আগে প্রকাশ্যে এক পুলিশ কর্মকর্তার মেয়েকে মারধরের ঘটনাও ঘটে সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের পাশে। ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত তারা নুন্নার কিশোর বাহিনীর সদস্য বলেও জানা গেছে।
তবে ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আকতার উজ্জামান গাজী হিরু বলেন, ‘একেবারেই যে কিশোর গ্যাং কালচার বা ইভটিজারের আনাগোনা এখানে নেই তা নয়। তবে যত বলা হচ্ছে, ততোটা নয়। এগুলো নির্মূল করতে হলে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
নিজের ওয়ার্ডের সমস্যা এবং সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে এই কাউন্সিলর বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে এই ওয়ার্ডের সকল রাস্তা-ঘাট সংস্কার হয়েছে। অনেক জায়গায় ড্রেনেজ ব্যবস্থাও হয়েছে। তবে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা থেকে ওয়ার্ডবাসীকে রক্ষায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার আরও উন্নতি প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অপরদিকে, নগরীর ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রধান সড়কগুলোর উন্নয়ন হয়েছে। তাছাড়া কিছু কিছু জায়গায় ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নও হয়েছে। তবে হালিমা খাতুন স্কুল লেন এবং পুলিশ লাইন সংলগ্ন আবাসিক এলাকা এন হোসেন এভিনিউর বাসিন্দারা এখনো উদ্বিগ্ন জলাবদ্ধতা নিয়ে।
হালিমা খাতুন লেনের বাসিন্দা আকলিমা বেগম বলেন, ‘হালিমা খাতুন স্কুল লেন এতোটাই নিচু যে সামান্য বৃষ্টিতেই হাঁটু সমান জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে সিটি করপোরেশনের কোনো ডাস্টবিন নেই। এ কারণে জিলা স্কুল সংলগ্ন পরেশ সাগর মাঠের একাংশ দখল করে ফেলা হচ্ছে কয়েকটি ওয়ার্ডের বর্জ্য। আর জমে থাকা বর্জ্য গরু-ছাগল, কুকুর গোটা মাঠে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে খেলার মাঠ ক্রমশই খেলার অনুপযোগী হয়ে উঠছে।
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘গোড়াচাঁদ দাস রোডে সিটি করপোরেশনের বড় একটি ডাস্টবিন ছিলো। সেখানেই ওই ওয়ার্ডের ময়লা ফেলা হতো। সেগুলো পরে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা এসে অপসারণ করতো। কিন্তু সেই ডাস্টবিনটি এখন ১৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয়। বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রথমে সেখানে একটি টিউবওয়েল স্থাপন করেন। পরে আওয়ামী লীগের কার্যালয় নির্মাণ করায় সেখানে ডাস্টবিনের চিহ্নও নেই।
যদিও সিটি করপোরেশনের এই ডাস্টবিনটি অপসারণের দীর্ঘ দিনের দাবি ছিলো স্থানীয় বাসিন্দাদের। কেননা ডাস্টবিনের পাশেই আবাসিক ভবনে বসবাসকারী মানুষেরা দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ ছিলো।
এ প্রসঙ্গে সদ্য উপ-নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজিব হোসেন খান বলেন, ‘আমি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কেউ নই। ডাস্টবিন দখল করে কার্যালয় নির্মাণের বিষয়টি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ ভালো বলতে পারবে। তাছাড়া পরেশ সাগরের মাঠে ময়লা-আবর্জনা ফেলার বিষয়ে সিটি করপোরেশন বলতে পারবে। এটা আমার দায়িত্ব না। আমি যতটুকু সম্ভব সাধ্যমতো ওয়ার্ডবাসীর উপকার এবং পাশে থাকার চেষ্টা করছি।
এইচকেআর