ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • ইসলামী আন্দোলন বরগুনার সভাপতি হলেন অলি উল্লাহ বরগুনায় ১৭ লাখ টাকার ৬৯০ কেজি নিষিদ্ধ শাপলা পাতা-গিটার মাছ জব্দ ওমান উপকূলে ছড়িয়ে পড়েছে তেল, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা লোডশেডিংয়ের সমাধান নিয়ে মন্ত্রী বললেন, আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই ফখরুল রাষ্ট্রপতি প্রার্থী, রাতারাতি বদলে গেলো তিন মন্ত্রণালয়ের সমীকরণ সেরা ‘সড়ক যোদ্ধা সম্মাননা’ জুবায়ের ইসলাম চৌধুরী ২৪ ঘণ্টায় বরিশালে ২৮মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড আগৈলঝাড়ায় শাপলা বিক্রি করে দিনে আয় ৩ হাজার টাকা বরিশাল রেঞ্জের নতুন ডিআইজি জুলফিকার আলী হায়দার চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি আর নেই
  • বরিশালের শেবাচিম হাসপাতাল

    রোগ নির্ণয়ের যন্ত্র বিকল রোগীর বেশুমার ধকল

    রোগ নির্ণয়ের যন্ত্র বিকল রোগীর বেশুমার ধকল
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    খোরশেদ আলম সরদার সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে গত বুধবার সকাল ৯টার দিকে চিকিৎসা নিতে আসেন বরিশালের শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের বহির্বিভাগে। শুরুতেই চিকিৎসক তাঁকে হাতের এক্স-রে করতে বলেন। সকাল ১০টার দিকে রেডিওলজি বিভাগে ২০০ টাকার রসিদ হাতে খোরশেদ সেই যে দাঁড়িয়েছেন, দুপুর সাড়ে ১২টায়ও এক্স-রে কক্ষে ঢুকতে পারেননি। ক্ষুব্ধ খোরশেদ হাতের ব্যথা সইতে না পেরে হাসপাতালের সামনের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এক্স-রে করতে ছোটেন।

    একইভাবে বাকেরগঞ্জের ভোজমহল গ্রামের তাহমিনা বেগম, ঝালকাঠির নলছিটির তিমিরকাঠী গ্রামের জসিম উদ্দিন ও নগরীর বাংলাবাজার এলাকার জাহিদুল ইসলাম শেবাচিম হাসপাতালে এক্স-রে করাতে না পেরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য হন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালটির ১৩ এক্স-রে মেশিনের আটটিই বিকল। তাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও আন্তঃ ও বহির্বিভাগের রোগীরা কম খরচের সরকারি এক্স-রে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।


     
    গত বুধবার সকাল ১১টার দিকে শেবাচিম হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের সামনে কথা হয় সদর উপজেলার চরমোনাই গ্রামের আসমা বেগমের সঙ্গে। তিনি ছয় বছরের ছেলে আলভিকে বহির্বিভাগে চিকিৎসক দেখাতে এসেছেন। চিকিৎসক আলভির এক্স-রে ও রক্ত পরীক্ষা দেন। আসমা বলেন, 'ছেলে কোলে লইয়া দাঁড়াইয়া রইছি। কহন যে সিরিয়াল পামু, জানি না! টাহা থাকলে বাইরে পরীক্ষা করাইতাম।'

    অভিন্ন ছবি আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষের মুখেও। সেখানে বাকেরগঞ্জের দাড়িয়াল গ্রামের চাষি স্বপন মুন্সী বলেন, 'ফি দিয়া দাঁড়াইয়া আছি, পরীক্ষার জন্য তো ডাকে না।' স্বপন মুন্সীর মতো জনা পঞ্চাশেক রোগীকে দেখা গেছে আলট্রাসনোগ্রাম কক্ষের সামনে জটলা পাকাতে। কখন আলট্রাসনোগ্রাম শুরু হবে, সেটা তাদের কেউই জানেন না। কেউ কেউ অধৈর্য হয়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ছুটছেন। তাঁদের একজন নগরীর রূপাতলীর বাসিন্দা সেকান্দার ফরাজী। তিনি বলেন, 'গরমে দাঁড়াইয়া থাহন যায় না। তাই বাইরে পরীক্ষা করাইছি।' অব্যবস্থাপনার কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেল, শেবাচিম হাসপাতালের পাঁচটি আলট্রাসনোগ্রাম যন্ত্রের তিনটিই বিকল। সচল দুটি মেশিনে রোগীদের সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।

    ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শেবাচিম হাসপাতাল দক্ষিণাঞ্চলের প্রধান এবং উন্নত সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। তবে হাসপাতালটির রেডিওলজি ও প্যাথলজি বিভাগসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ রোগ নির্ণয় যন্ত্র বিকল পড়ে আছে বছরের পর বছর। ফলে প্রতিদিনই হাসপাতালে ভর্তি থাকা এবং বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত রোগীকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যেতে হয় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। এতে রোগীরা যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, তেমনি ভোগান্তিও পোহাতে হচ্ছে সীমাহীন।

    হাসপাতালের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, হাসপাতালের দুটি সিটিস্ক্যান মেশিনের দুটিই অচল। এর মধ্যে একটি আর কোনোদিন সচল হবে না। অন্যটি অচল হয়েছে ২০২০ সালের জুনে। ফলে হাসপাতালে সিটিস্ক্যান সেবা বন্ধ প্রায় দু'বছর।

    একটি মাত্র এমআরআই মেশিন পাঁচ বছর ধরে বিকল। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় মেশিনটি আর সচল হবে না। নতুন একটি এমআরআই মেশিন দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ে বারবার চিঠি দিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

    সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে এক্স-রে বিভাগ। এক্স-রে যন্ত্র আটটিই বিকল। বাকি পাঁচটি সচল যন্ত্রের মধ্যে শিশু ওয়ার্ড ও করোনা ওয়ার্ডে একটি করে দেওয়া হয়েছে। ফলে মাত্র তিনটি এক্স-রে মেশিন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় তিনশ রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে রোগীদের দুর্ভোগ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয় অসুস্থ রোগীদের।

    ইকোকার্ডিওগ্রাম মেশিন অচল ও ক্যাথল্যাব বন্ধ থাকায় হৃদরোগে আক্রান্তরা উপযুক্ত সেবা পান না। ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ইকোকার্ডিওগ্রাম সেবা বন্ধ। ক্যাথল্যাব বন্ধ থাকায় তিন বছর ধরে এনজিওগ্রাম করা যাচ্ছে না।

    শেবাচিম হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের এক সহকারী অধ্যাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাসপাতালে ইকোকার্ডিওগ্রাম বন্ধ থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে ইকোকার্ডিওগ্রাম করাতে গিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন রোগীরা। এনজিওগ্রাম বন্ধ থাকায় রোগীদের ঢাকায় গিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে তা করাতে হচ্ছে।

    তিন বছর ধরে অচল ক্যান্সার রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহূত কোবাল্ট-৬০ মেশিনটি। অনেকটা অচল অবস্থা চলছে শেবাচিম হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ।

    শেবাচিমের চিকিৎসা সরঞ্জাম তদারক কর্মকর্তা (ইন্সট্রুমেন্ট কেয়ার টেকনোলজিস্ট) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব রোগ নির্ণয়ের যন্ত্র কেনা হয়েছিল। যেগুলোর গ্যারান্টির মেয়াদ এখনও রয়েছে, সেগুলো মেরামতের জন্য সংশ্নিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে কোবাল্ট-৬০ মেশিনটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় এটি আর সচল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সিটিস্ক্যান, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন নতুন কেনার জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো উত্তর মেলেনি। নতুন এমআরআই মেশিন পাওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দিলেও বরাদ্দ মিলছে না।

    এ ব্যাপারে বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, শেবাচিম হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা নানা কারণে বিপর্যস্ত। রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রগুলো বিকল থাকায় রোগীরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

    শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, একটি নতুন সিটিস্ক্যান মেশিন এ সপ্তাহেই পাওয়া যাবে। এমআরআই মেশিনের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্য রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রগুলো নতুন পেতে অথবা সচল করার জন্য মন্ত্রণালয়ে বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

    টেকনোলজিস্ট সংকট: শেবাচিম হাসপাতাল শুরুতে ছিল ৫০০ শয্যার। এখন হাসপাতালটি এক হাজার শয্যার হলেও গড়ে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকে প্রায় দেড় হাজার। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন আরও প্রায় এক হাজার রোগী। এ অবস্থায় বাড়েনি টেকনোলজিস্টের পদ। ৯ জন টেকনোলজিস্টের পদ নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ৫৫ বছর পরও বাড়েনি জনবল। টেকনোলজিস্টের ৯ পদের বিপরীতে ৯ জন নিয়োগ দেওয়া আছে। তবে দু'জন আছেন শিক্ষা ছুটিতে। ফলে এত বড় হাসপাতালে সাতজন টেকনোলজিস্ট দিয়ে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

    ফায়দা লুটছে ডায়াগনস্টিক সেন্টার: শেবাচিম হাসপাতালের সামনে আধা কিলোমিটার সড়কের মধ্যে গড়ে উঠেছে ৩৮টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার। প্রতিদিন সকাল ৯টার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টারে শত শত রোগী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে আসেন। শেবাচিম হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানায়, হাসপাতালের সামনের ডায়াগনস্টিক সেন্টার মালিকরা মার্কেটিং প্রতিনিধির নামে দালাল পোষেন। ওই দালালরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত হাসপাতালের বিভিন্ন পরীক্ষাগার চত্বরে অবস্থান করে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীদের প্রলুব্ধ করে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে নিয়ে যান।


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ