ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • ইসলামী আন্দোলন বরগুনার সভাপতি হলেন অলি উল্লাহ বরগুনায় ১৭ লাখ টাকার ৬৯০ কেজি নিষিদ্ধ শাপলা পাতা-গিটার মাছ জব্দ ওমান উপকূলে ছড়িয়ে পড়েছে তেল, পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা লোডশেডিংয়ের সমাধান নিয়ে মন্ত্রী বললেন, আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই ফখরুল রাষ্ট্রপতি প্রার্থী, রাতারাতি বদলে গেলো তিন মন্ত্রণালয়ের সমীকরণ সেরা ‘সড়ক যোদ্ধা সম্মাননা’ জুবায়ের ইসলাম চৌধুরী ২৪ ঘণ্টায় বরিশালে ২৮মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড আগৈলঝাড়ায় শাপলা বিক্রি করে দিনে আয় ৩ হাজার টাকা বরিশাল রেঞ্জের নতুন ডিআইজি জুলফিকার আলী হায়দার চীনের অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি আর নেই
  • দুই দিনে ১৮৮০০০ টাকা  জরিমানা 

    প্রশাসনের  এ্যাকশনেও নিয়ন্ত্রণহীন তেলের বাজার

    প্রশাসনের  এ্যাকশনেও নিয়ন্ত্রণহীন তেলের বাজার
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সম্প্রপ্তি সরকার বোতলজাত ও খোলা সয়াবিনের মূল্য নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে। নতুন নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, ভোক্তাপর্যায়ে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৮ টাকা ও খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮০ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। পাশাপাশি ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৮৫ টাকা। নতুন দাম নির্ধারণের পরেও বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। আবার দোকানিদেরও নতুন দামে তেল বিক্রিতে অনীহা দেখা যাচ্ছে। বাজারে তেলের সরবরাহ, বাজারদর জানতে নগরীর বেশ কয়েকটি বাজারে যাই। সেখানে তেল সরবরাহকারী, বিক্রেতা ও ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে ভোজ্যতেলের বর্তমান অবস্থা জানতে চেষ্টা করি। 

    নগরীর পোর্টরোড, রুপাতলী, নতুনবাজার, চৌমাথা বাজার ঘুরে দেখা যায় এলাকা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন দাম। যে যেভাবে পারছেন অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি করছেন। আবার অনেক দোকানিকে দেখা গেল তেল বিক্রিতে অনীহা। এদিকে নতুন দাম নির্ধারণে বিক্রির বিষয় নানাভাবে তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা।

    ইতোমধ্যেই নগরীসহ দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে অভিযানে মাঠে নেমেছে সংস্থাটির তদারকি টিম। তেলের সরবরাহ, মজুদ, পাইকারি ও খুচরা দোকানগুলোতে সংকটের কারণ খতিয়ে দেখছেন টিমের সদস্যরা। পাশাপাশি অতিরিক্ত মূল্যে তেল বিক্রি করায় ব্যবসায়িকে করা হচ্ছে জরিমানা। অপরদিকে সয়াবিন তেলের এই লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে অনেকটাই অসহায় হয়ে পড়েছেন মধ্যবিত্ত এবং নিন্ম মধ্যবিত্তরা। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর মনিটর দাবি করেছেন সাধারন মানুষ।  

    সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, একশ্রেণির ব্যবসায়ী ভোজ্যতেলের বাজারে এ অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বুধবার সকালে নগরীর রুপাতলী বাজারের বেশ কয়েকটি দোকান ঘুরে বোতলজাত সয়াবিন তেল দেখা গেল না। আনোয়ার নামের নামের এক ব্যবসায়ীর দোকানে দেখা এক গ্যালনে অল্প পরিমাণ সয়াবিন। পাশেই আরেকটি গ্যালনে সরিষার তেল। সংবাদকর্মী পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে কথা বলতে চাইলেন না। পরে বললেন, “সাংবাদিকরা তো আসল কথা কইতে পারে না। বাজারে কারা তেল নাই কইরা দিল, তাদের নাম তো আপনারা ল্যাখেন না।” কারা বাজারে তেল নাই করে দিল, এবার জানতে চাই তার কাছে। তিনি প্রথমে হাসলেন। পরে বললেন, “আমরা তো ব্যবসায়ী। আমরা ছোট দোকানদার। আমরা তো তেল আমদানী করি না। কারখানাও নাই আমাদের। কারখানার মালিকরা আর ডিলাররা যদি তেল না ছাড়ে, তাইলে আমরা তেল পামু কই?” বোতলজাত তেল তার দোকানে নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখন সরকার যেই নতুন দাম ঠিক করছে, ওইদাম বোতলে এখন লাগানো অয় নাই। বোতলে নতুন দাম লাগাাইতে সময় লাগবে। দুই একদিনের মধ্যেই চলে আইবো।” এখানেই কথা হয় বাজার করতে আসা খোকন হোসেন (৩৬) সঙ্গে। 

    তিনি জানালেন, ঈদের ছুটির পর বাজার করতে এসেছেন। মাছ ও সবজি কিনতে পারলেও তেল কিনতে পারেননি এখনও। তিনি বলেন, “আগে রূপচাঁদার ৫ লিটারের বোতল কিনতাম। এখন আজকে বাজারে তা পাচ্ছি না। গতকালও পাইনি। কিন্তু আজকে তেল না নিয়ে বাসায় যাওয়া যাবে না। বোতল না পেলে এখন খোলা তেল কিনেই নিতে হবে। কিন্তু খোলা কিনে বাসায় নিতে হলেও তো একটি বোতল লাগবে। কয়েকটি দোকান ঘুরে এক দোকান থেকে লিটার প্রতি ২১০ টাকা তেল কিনেছেন তিনি।  

    পোর্টরোড বাজারেই কথা হয় সারোয়ার আলম (৪২) এর সাথে। একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন তিনি। বললেন, মাসের প্রথম দিকে পুরো মাসের বাজার করেন তিনি। এবার ঈদ থাকায় চলতি মাসের শুরুতে মাসের বাজার করেননি। বললেন, “ঈদের ছুটির মধ্যেই যখন প্রথমে সয়াবিন তেল বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না শুনলাম তখন ভেবেছিলাম গুজব হবে। ঈদের পরে দেখলাম দোকানে আর তেলই পাওয়া যায় না।” নতুন বাজারে যখন আসি তখন বেলা প্রায় বারোটা। সবজি ও মাছের বাজারের দিকে ভিড় থাকলেও মুদি দোকানে তেমন ভিড় দেখা গেল না। এখানেই কথা হয় কানিজ ফাতেমা (৩৫) নামের একজনের সাথে। এই গৃহিণী জানালেন, স্বামী চকবাজারে ব্যবসা করেন। তাকেই বাজার করতে হয়। তেলের দাম নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি দিলেন ভিন্ন তথ্য। বললেন, “আমরা সবসময়ই সরিষার তেল ব্যবহার করি রান্নায়। তাই বাজারে তেলের উপস্থিতি নিয়ে আমাদের ভাবতে হয় না। ” 

    চৌমাথা বাজারে প্রবেশ করি তখন বিকেল হয়ে এসেছে। বৃষ্টির পানি ও কাদায় মাখামাখি অবস্থা। দোকানগুলোতে ভিড় কম। কথা হয় ব্যবসায়ী মিজানের সঙ্গে। এখানে প্রায় ৭ বছর যাবৎ ব্যবসা করেন। দোকানে সয়াবিন তেলের দেখা মিলল না। তার কাছে জানতে চাই, দোকানে কোনো তেলের মজুত আছে কিনা? মিজান বলেন, তেল পাবো কই! ঈদের আগেই সব শেষ। এই ব্যবসায়ীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, দাম বৃদ্ধির ঘোষণার পরেও তেল সংকট কেন? তিনি বলেন, “সব সিন্ডিকেট। এর বেশি বলা যাবে না।” কীসের সিন্ডিকেট জানতে চাইলে হাসলেন। তারপর বললেন, “এই দামে অইবো না। দাম আরও বাড়বো। দেইখেন।” এখানেই কথা হয় নিজাম নামে দোকানির সঙ্গে। অল্প কয়েকটি বোতল তেল দেখা গেল। পরিচয় গোপণ করে তার কাছে তেলের দাম জানতে চাই। বললেন, বোতলের গায়ে যা লেখা আছে তার চেয়ে ৫০ টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে। দাম কমানোর অনুরোধ জানালে ১০ টাকা কমাতে রাজি হলেন। তখন তাকে বললাম, বোতলের গায়ের দামেই বিক্রি করেন। তিনি বললেন, এই কথা ভুলে যান। এই দামে আর তেল চোখে দেখা লাগবে না।  এদিকে বাজারে তেলের মূল্য ঠিক রাখতে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে অভিযান নিয়মিত পরিচালনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। 

    অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়,  বুধবার (১১ মে) নগরীর বাজার রোড, হাটখোলা এবং পিঁয়াজপট্টি এলাকায় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এসময়  নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অতিরিক্ত মূল্যে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রয় করায় ৩টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অতিরিক্ত মূল্যে খোলা সয়াবিন তেল বিক্রির অপরাধে মেসার্স পুলিন বিহারী ঘোষ স্টোরকে ৪০ হাজার টাকা, মেসার্স মোল্লা এন্টারপ্রাইজকে ২০ হাজার টাকা এবং মেসার্স নিউ রায় এন্ড ব্রাদার্সকে ৩০ হাজার টাকা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জরিমানা আরোপ করা হয়। অভিযান চলাকালে হাটখোলা এলাকায় একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পূর্বের দামে ক্রয়কৃত ০৩ ড্রাম তেল প্রতি লিটার পূর্ব মূল্য ১৩৬ টাকা দামে সাধারণ জনগণের মাঝে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। 

    এর আগে  মঙ্গলবার (১০ মে) নগরীর সাগরদী বাজার ও বাবুগঞ্জ উপজেলার রহমতপুর এলাকায় বিক্রয় মূল্য মুছে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রির অপরাধে দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে ১৮ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে  রহমতপুর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় শ্রীগুরু ভান্ডার এবং ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের বাসা থেকে ৭০০ লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল উদ্ধার করা হয়। আগের কেনা এসব সয়াবিন তেলের বোতল থেকে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য মুছে অতিরিক্ত দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে তিনি বাসায় মজুত করে রেখেছিলেন। এ কারণে তাকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আর উদ্ধার করা সয়াবিন তেল মাধবপাশা বাজার এবং কাশিপুর বাজারে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ ক্রেতাদের মাঝে আগের দামে বিক্রি করা হয়। সাগরদী বাজারে সুজন স্টোর থেকে তেলের বোতলের সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য মুছে ফেলা পাঁচ লিটার তেল উদ্ধার করা হয়। এ কারণে দোকান মালিককে তিন হাজার টাকা জরিমানা এবং উদ্ধার করা তেল আগের দামে বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া সাগরদী বাজারে কবির স্টোর নামে একটি দোকানে আগের দামের আরও ১০০ বোতল সয়াবিন তেল পাওয়া যায়। পরে তাৎক্ষণিক মাইকিং করে ওই ১০০ লিটার সয়াবিন তেল আগের দামে অর্থাৎ ১৬০ টাকা লিটার মূল্যে সাধারণ ক্রেতাদের মাঝে বিক্রি করা হয়েছে। 

     অন্যদিকে সয়াবিন তেল সরকার নির্ধারিত মূল্যে খোলাবাজারে বিক্রি করার অভিযোগে মঙ্গলবার সকালে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও দুমকি উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) হোসনেয়ারার নেতৃত্বে মুরাদিয়ার বোর্ড অফিস বাজারে এ অভিযান চালানো হয়। সয়াবিন তেল মজুদ রাখার দায়ে এক ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। 

    এছাড়া  তেল মজুত ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগে বুধবার (১১ মে) দুপরে উপজেলার পাথরঘাটা ও কাকচিড়া বাজারে অভিযান চালিয়ে মুক্তা স্টোরে ৮০০ টাকার তেল ৯৮০ টাকায় বিক্রির প্রমাণ বরগুনার ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বিপুল বিশ্বাস। এসময় ওই প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

    পরে শাহিন স্টোর নামের একটি তেলের ডিলারের দোকানে অভিযান চালিয়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অপরদিকে তেল মজুত করে বাড়তি দামে বিক্রি করার অভিযোগে বুধবার সকালে ঝালকাঠির আড়তদারপট্টি এলাকায় অভিযান চালায়  ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এ সময় গৌতম চন্দ্র হালদার নামে এক ব্যবসায়ীর গোডাউন থেকে মজুত করা ১৬ হাজার ৩৩৬ লিটার সয়াবিন তেল উদ্ধার করা হয়। অবৈধভাবে তেল মজুত রাখার দায়ে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় ওই ব্যবসায়ীকে। পরে তেল নিতে আসা সাধারণ মানুষের মাঝে সরকার নিধারিত মূল্যে উদ্ধার করা তেল বিক্রি করা হয়। অভিযান পরিচালনা করেন জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ইন্দ্রানি দাস। 


    এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বরিশাল জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. শাহ্ শোয়াইব মিয়া জানান জনস্বার্থে বাজার তদারকিমূলক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। 


     


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ