পরীক্ষা ছাড়াই বরিশাল থেকে যাত্রা করে লঞ্চ

অত্যাধুনিক বিলাসবহুল লঞ্চগুলোতে যাত্রীবোঝাই করে বরিশাল কিংবা ঢাকা নদীবন্দর থেকে রওনার আগে ইঞ্জিনসহ অন্য যন্ত্রাংশ পরীক্ষানিরীক্ষা করা হচ্ছে না। এসব লঞ্চগুলোতে সার্বক্ষণিক ফোরম্যান (ইঞ্জিনসহ যন্ত্রাংশ পরীক্ষানিরীক্ষার দক্ষ মেকানিক) না থাকায় মাঝপথে সমস্যা সমাধানের আর সুযোগ থাকছে না। বিলাসবহুল এসব লঞ্চের মালিকরা ফোরম্যান দিয়ে কেবলমাত্র ঢাকা নদীবন্দর থেকে ইঞ্জিনসহ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করিয়ে থাকেন।
তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কোনো লঞ্চের জন্য নির্দিষ্ট করে কোনো ফোরম্যান নেই। ফোরম্যান এক দিনে কয়েকটি লঞ্চের ইঞ্জিনসহ যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করে থাকেন। লঞ্চ মালিকরা মূলত টাকা সাশ্রয় করতেই চুক্তিভিত্তিক এসব ফোরম্যান দিয়েই দায়সারাভাবে লঞ্চগুলো পরীক্ষা করে থাকেন। কেননা ঢাকা প্রান্ত থেকে ফোরম্যান দিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হলেও বরিশাল থেকে কোনো ব্যবস্হা না থাকায় তা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
বিভিন্ন লঞ্চ কোম্পানির ডকইয়ার্ডে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদেশ থেকে জেনারেটর এনে তাতে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহারের মাধ্যমে লঞ্চের ইঞ্জিনে রূপান্তর করা হয়। বিভিন্ন ডকইয়ার্ডে এসব কার্যক্রম ফোরম্যান পদের মেকানিকরাই করে থাকেন। তবে নদীতে চলাচলরত অবস্হায় বড় ধরনের ত্রুটিবিচু্যতি দেখা না দিলে সাধারণত ডকইয়ার্ডে মেরামত হয় না। সামান্য ত্রুটিতে ঝুঁকি নিয়েই অনেক লঞ্চ চলাচল করছে। কেননা একটি লঞ্চ ডকইয়ার্ডে মেরামতে নিলেই মেরামত ব্যয় বেড়ে যায়। এ ব্যয় কমানোর জন্য অনেক লঞ্চ মালিক ঝুঁকি নিয়েই লঞ্চ পরিচালনা করে থাকেন। এতে প্রায়ই মাঝনদীতে দুর্ঘটনা ঘটলেও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখিয়ে চলাচল করে আসছে। লঞ্চগুলোতে কর্মরতরা এসব তথ্য দিলেও মালিকরা বলছেন উলটো কথা। সুন্দরবন নেভিগেশন কোম্পানির চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল যাত্রী পরিবহন সংস্হার ১ নম্বর সহসভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু জানান, দক্ষ ফোরম্যান দ্বারা লঞ্চগুলো যাত্রী নিয়ে রওনার আগে ইঞ্জিন, পাখাসহ সব যন্ত্রাংশ পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়ে থাকে। এসব ফোরম্যান মাসিক বেতনে এসব দায়িত্ব পালন করে আসছেন, কেননা বিপুল টাকার এ নৌযানে ত্রুটি থাকলে মালিকপক্ষেরই বেশি ক্ষতি হয়ে থাকে। এছাড়াও লঞ্চের মাস্টার-ড্রাইভার তারা সরকারি সনদধারী দক্ষ। এসব মাস্টার ও ড্রাইভারগণ লঞ্চে যে কোনো ত্রুটিবিচু্যতি হলে তার সমাধানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নৌরুটে নিরাপদ যাত্রায় লঞ্চগুলোতে সার্বক্ষণিক দক্ষ ফোরম্যান রাখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বরিশাল জেলা সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা। তিনি বলেন, ঢাকা-বরিশালসহ বিভিন্ন রুটের উভয়প্রান্ত থেকে লঞ্চ যাত্রী নিয়ে রওনার আগে বিআইডব্লিউটিএর তদারকির মাধ্যমে ফোরম্যানদের দিয়ে সব যন্ত্রাংশ পরীক্ষা করা হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ রক্ষা পাবে। কেননা সম্প্রতি কয়েকটি দুর্ঘটনায় যেভাবে প্রাণহানি ঘটছে, তাতে লঞ্চগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে সব বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কতৃর্পক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রধান প্রকৌশলী মো. মহিদুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, ঢাকা প্রান্ত থেকে বিআইডব্লিউটিএর একটি টিম লঞ্চগুলো পরীক্ষা করে থাকে। তবে লঞ্চগুলোতে ফোরম্যান সার্বক্ষণিক থাকলে ভালো হয়।
প্রসঙ্গত, ঢাকা সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলসহ ৪৪টি রুটে ২২০টি লঞ্চ চলাচলের অনুমতি রয়েছে। এর মধ্যে দৈনিক গড়ে প্রায় ৬০টির মতো লঞ্চ বিভিন্ন রুটে যাতায়াত করে থাকে। তার মধ্যে ঢাকা-বরিশাল রুটে সবচেয়ে বেশি অত্যাধুনিক বিলাসবহুল লঞ্চ রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার নৌদুর্ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ৩ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। সর্বশেষ গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর ঝালকাঠীর সুগন্ধা নদীতে অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৪২ জন যাত্রী মারা গেছেন।
এইচকেআর