ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বরিশালের ৫ জেলাসহ ৪৩ জেলা, ডুবেছে ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টরের ফসল বরিশালে মাদক মামলায় রোহিঙ্গা তরুণীর ৩ বছরের কারাদণ্ড শিক্ষামন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ মেহেন্দীগঞ্জে প্রবেশপত্রের সঙ্গে অসংগতি থাকায় এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি রিপা মুলাদীতে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ায় সেতুর নিচ দিয়ে চলাচল ২০০ পরিবারের  ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে ইটের টুকরা নিক্ষেপ, তদন্ত করছে পুলিশ বরগুনার ইতিহাসে প্রথম ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেল জমজ ৩ বোন শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর পাথরঘাটায় বাজারে আগুন, ৩০ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত   সুন্দরবনে ‘ছোট জাহাঙ্গীর’ বাহিনীর প্রধানসহ ২৭ ডাকাতের আত্মসমর্পণ
  • উপকূলে অবৈধ ট্রলিংয়ের দৌরাত্ম্য, হুমকিতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ

    উপকূলে অবৈধ ট্রলিংয়ের দৌরাত্ম্য, হুমকিতে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর, আলীপুর, কুয়াকাটা ও আশাখালী মৎস্য বন্দর সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় জলসীমায় দিন দিন বাড়ছে অবৈধ ও রূপান্তরিত আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের কার্যক্রম। সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রচলিত আইন অমান্য করে পরিচালিত এসব ট্রলারে নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছের পোনা, রেণু, ডিমওয়ালা মা মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী আহরণ করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

    স্থানীয় জেলে ও মৎস্য সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এ অঞ্চলে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় থাকলেও চলতি বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। দ্রুত অধিক লাভের আশায় সাধারণ কাঠের ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

    নিয়ম অনুযায়ী এসব বড় ট্রলিং বোটের গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার কথা থাকলেও বাস্তবে তারা উপকূলের অগভীর জলসীমায় প্রবেশ করে মাছ শিকার করছে। স্থানীয় জেলেদের দাবি, অনেক সময় উপকূল থেকে কয়েক নটিক্যাল মাইলের মধ্যেই জাল ফেলে মাছ আহরণ করা হয়। এতে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ও অভয়াশ্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

    মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রলিংয়ে ব্যবহৃত বটম ট্রলিং পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থলসহ বিভিন্ন জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

    এছাড়া ট্রলিং বোটগুলোতে ফিস ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে সহজেই মাছের অবস্থান শনাক্ত করে ব্যাপক হারে আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে ছোট নৌকা ও সাধারণ ট্রলারনির্ভর জেলেরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।

    মহিপুর ও আলীপুরের কয়েকজন জেলে অভিযোগ করেন, বড় ট্রলিং বোট প্রায়ই তাদের জালের ওপর দিয়ে চলাচল করে, ফলে মূল্যবান জাল ছিঁড়ে গিয়ে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি ও হুমকিরও সম্মুখীন হতে হয়।

    মহিপুরের জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা দিনের পর দিন সমুদ্রে গিয়ে মাছ না পেয়ে ফিরে আসি। অথচ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছ ও পোনা নিধন করছে। প্রশাসন চাইলে দ্রুত এসব বন্ধ করা সম্ভব।

    জেলে আবুল কাশেম বলেন, ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন লাখ লাখ রেণু নিধন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে জেলেদের জীবিকা বড় সংকটে পড়বে।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্র দূষণ এবং অবৈধ ট্রলিংয়ের সম্মিলিত প্রভাবে দেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ডিমওয়ালা মা মাছ ও পোনা নিধনের ফলে ইলিশ, পোয়া, রূপচাঁদা, চিংড়িসহ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন মাছের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা, রপ্তানি আয় এবং নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

    জেলেদের একাংশের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও নৌ পুলিশের একটি অংশের পরোক্ষ সুবিধার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ ট্রলার প্রকাশ্যে মাছ শিকার চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

    মহিপুর মৎস্য আড়ৎ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা বলেন, অবৈধ ট্রলিং বন্ধে একাধিকবার আলোচনা হলেও বাস্তবে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। বরং পরিস্থিতি দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। কঠোর নজরদারি ছাড়া এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

    ফিশারিজ কর্মকর্তা বখতিয়ার আহমেদ বলেন, নিষিদ্ধ জালের কারণে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধন অব্যাহত থাকায় দেশের মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। খাদ্য নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।

    কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান জানান, ট্রলিং বোট সংক্রান্ত বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। অবৈধ মাছ শিকার ও নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকলেও গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনায় কিছু লজিস্টিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

    পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, অবৈধ ট্রলিং প্রতিরোধে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আদালতে মামলা চলমান রয়েছে এবং কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, জনপ্রতিনিধি ও জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নজরদারি ও অভিযান আরও জোরদার করা হবে।


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ