ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • ববিতে শিবিরকর্মীর ওপর মব সৃষ্টি, ছাত্রদল সভাপতিসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ বরিশালে যথাযোগ্য মর্যাদায় জুলাই শহীদ দিবস পালিত জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে আলেকান্দা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে স্মরণসভা ও দোয়া  র‍্যাব-৮'র সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদুর বরখাস্ত প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সমগতের বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক ক্যাম্প  জিয়াউর রহমান হত্যায় পলাতক আসামি মেজর মোজাফফর আটক বানারীপাড়ায় জুলাই শহীদ দিবসে আলোচনা সভা ও শ্রদ্ধাঞ্জলি  বরিশালে ১১দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশ জনসমুদ্রে পরিণত হবে: হেলাল বরিশালে পুলিশের চলমান বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার ২১  বরিশালে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
  • বরগুনায় নিষেধাজ্ঞায় থেমে গেছে সব কোলাহল

    বরগুনায় নিষেধাজ্ঞায় থেমে গেছে সব কোলাহল
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। জেলে, পাইকার আরৎদারসহ মৎস্যজীবীদের পদচারণায় মুখর থাকে গোটা বিএফডিসি এলাকা। একের পর এক ট্রলার নোঙর করে বিএফডিসি ঘাঁটে। 

    ঘাঁট শ্রমিকরা ঝাপি নিয়ে ছুটে আসে, ট্রলার থেকে মাছ তুলে অকশন শেডে স্তপ করা হয়। এরপর শুরু হয় নিলামে ডাক, এই তিন হাজার চারশ, তিন হাজার পাঁচশ, চারহাজার, চারহাজার একশ....।  বিক্রি শেষ, ক্রেতা মাছ বুঝে নিয়ে প্রক্রিয়াজাত করে গাড়িতে তুলে চালান করে দেন। 

    সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায, এখন এখানে কেউ কোথাও নেই, মাছের উচ্ছিষ্ট খেয়ে উদরপূূর্তির জন্য শুধু কিছু কাকেদের ওড়াওড়ি ছাড়া গোটা এলাকা এখন সুনসান নিরব। বলছিলাম দেশেরে ২য় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বিএফডিসি পাথরঘাটার কথা।

    মা ইলিশের প্রজনন নিরাপদ করতে গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাত রাত থেকে সাগর ও নদীতে সব ধরনের মাছ শিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আর প্রশাসনের এই নির্দেশনা মেনে (১২  অক্টোবর) দুপুর থেকেই দেশের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র বরগুনার পাথরঘাটার বিএফডিসি ঘাটে সমুদ্র থেকে ফিরছে অসংখ্য ট্রলার। এই জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪০ হাজার ৫০০ জন।

    ১২ অক্টোবর থেকে ২ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ২২ দিনের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। দিনটি সামনে রেখে আড়তদার-মৎস্যজীবীসহ সব শ্রেণীর মানুষের প্রস্তুতি থাকে। ১১ অক্টোবর থেকেই পাততারি গুটিয়ে বাড়ির পথ ধরেন।

    বঙ্গোপসাগর তীরবর্তি উপক‚লীয় উপজেলা পাথরঘাটা মৎস্য আহরণের অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। এখান থেকেই জেলেরা বিভিন্ন হাটে মাছ বিক্রি করতে নিয়ে যেত। পরে এখানেই গড়ে ওঠে মৎস্যকেন্দ্র। এখন আর মাছ বিক্রির জন্য জেলেদের অন্য কোথাও যেতে হয় না, বরং মৎস্য ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। বিনিয়োগ হয় কোটি কোটি টাকা। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ ইলিশ যায়। সরকারের রাজস্ব আয় হয় মোটা অঙ্কের। আর এভাবেই ঢালচর ইলিশকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ এক জনপদে পরিণত হয়।

    পাথরঘাটার অবস্থান বরগুনা জেলায়। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মোহনা, পশ্চিমে বলেশ্বর নদের ওপাড়েই সুন্দরবন। আর উত্তরে দেশের অন্যতম ইলিশের ভান্ডার বিষখালী নদী। 

    বছরান্তে ইলিশ ধরার মৌসুম এলে হেসে ওঠে এই জনপদের মানুষ। সাড়া পড়ে যায় চারদিকে। মৌসুমের জন্য জেলেরা নতুন জাল কেনেন, ট্রলার মেরামত করেন, ট্রলারে লাগিয়ে নেন সৌর বাতি। আড়তদার আগের বছরের হিসাবের খাতা বস্তাবন্দি করে লাল কাপড়ে মোড়ানো নতুন খাতায় হিসাব খোলেন।

    ইলিশ মৌসুম ঘিরে এ এক অন্যরকম প্রস্তুতি। এই সময়ের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর ভর করে কেউ বাড়ির ঘরদোর ঠিক করার প্রস্তুতি নেন, বউ-ছেলেমেয়ের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা, ছেলেমেয়ের বিয়ে কিংবা দীর্ঘমেয়াদে অসুখে ভোগা কাউকে ডাক্তার দেখানোর চিন্তাটাও ইলিশের মৌসুমকে কেন্দ্র করেই এই অঞ্চলের মানুষ ভেবে রাখেন। এটা শুধু পাথরঘাটার জন্য নয়, সব ইলিশ ঘাটের চিত্র এমনই।

    পাথরঘাটা পৌরশহর থেকে শুরু করে আশপাশের গোটা এলাকার এক তৃতীয়াংশ মানুষের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম মাছ শিকার। ইলিশের মৌসুম এলেই এই এলাকায় একটা রমরমা অবস্থা বিরাজ করে। 

    সেই জমজমাট অবস্থা এবং ম্রিয়মান এই সময়ের মধ্যে তফাত অনেক। ভরা মৌসুমে ইলিশের ঝুড়িটা পর্যন্ত যেন ইলিশের অপেক্ষায় থাকে। ঘাটে শত শত ইলিশ ট্রলারেরও একই অপেক্ষা। 

    আবার এখানে কিছু মানুষ অপেক্ষা করেন বড় মাছের বাজারে ইলিশ পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এত কষ্টের পরে মৌসুমের শেষ দিকে এসে যেন সবার চেহারায় অন্য এক দ্যুতি ধরা পড়ে। 

    কেননা প্রস্তুতি শুরু হয় তখন বাড়ি ফেরার। মৌসুমের শেষের দিকে বাড়িতে বাড়িতে খাওয়া-দাওয়ার ধুম পড়ে। মাঝি জেলেদের দাওয়াত দিয়ে না খাওয়ালে, নতুন কাপড় না দিলে অপূর্ণতা থেকে যায়। 

    যদিও ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাবের কারণে এসব রেওয়াজ এখন আর আগের মতো পালন হয় না। এক সময় মৌসুমের শেষে মাঝির বাড়িতে খাসি জবাই করে খাওয়ানো হতো। ইলিশের ভরা মৌসুমে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করে পাথরঘাটার মানুষের নানান ব্যস্ততা নজরে আসে। রিপনের হোটেল অথবা কিংবা আলমাসের খাবার ঘর কোথায় বসার জায়গা পাওয়া যায় না। রাতদিন সবার সমান ব্যস্ততা। 

    ইলিশের মৌসুমকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে ওঠে নানান ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য। মুদি দোকানের সদাইপাতি থেকে শুরু করে ইলিশ ধরার ট্রলারের তেল-ডিজেল ব্যবসা জমে যায়। বরফ কলের শ্রমিকদের বিরাম নেই, ইলিশ সংরক্ষণের জন্য বরফের ব্যবসাও এখানে জমজমাট হয়ে ওঠে।

    পাথরঘাট সদর ইউনিয়ন, চরদুয়ানী, কাঁঠালতলী, কাকচিড়ামসহ বঙ্গোপসাগরের মোহনা ও নদী তীরবর্তি গ্রামগুলোর মানুষ অধিকাংশই এখন পেশাজীবী জেলে। 
    এখানে চোখে পড়ে কয়েক ধরনের ট্রলার-নৌকা। এগুলো তিনভাগে বিভক্ত। এর মধ্যে প্রথম ভাগে ফেলা যায় বড় ট্রলারগুলো। এগুলো গভীর সমুদ্রে ইলিশ ধরতে যায়। এতে লোক থাকে ১৬ থেকে ২২ জন। এ ধরনের নতুন ট্রলার জালে ভাসাতে ৪০ লাখ থেকে এক কোটি টাকা পযন্ত খরচ হয়। সঙ্গে আরও যোগ হয় ১৫ লাখ থেকে ৩০ লাখ টাকার জাল। 

    ইঞ্জিন এবং অন্যান্য খরচ আছে আরও ১০ লাখ। গভীর সমুদ্রগামী এই ট্রলারগুলো আবার দু’ভাবে বিভক্ত। একটি ‘লাল জাল’ এবং অপরটি ‘সাদা জাল’ হিসেবে পরিচিত। লাল এবং সাদা রঙের সুতার তৈরি জাল ব্যবহার করে বলে এদের এই নাম। লাল জালের ট্রলার একটু বেশি প্রভাবশালী।

    মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা ট্রলাগুলো ‘ডুবা ট্রলার’ হিসেবে পরিচিত। এগুলো সমুদ্র মোহনা এবং নদীতে ইলিশ ধরে। ভ‚মি থেকে অন্তত ৩৫ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে যায় এই ট্রলার। 

    এই ট্রলারে লোক থাকে ৬ থেকে ৮জন। এই ধরনের ট্রলার জলে ভাসাতে সব নিয়ে খরচ পড়ে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা। প্রতি মৌসুমে এই ট্রলার চালাতে অন্তত ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পূঁজি নিয়ে নামতে হয়। অন্যদিকে ছোট ইলিশ নৌকাগুলো সাধারণত নদীতে জাল ফেলে। 

    কারেন্ট জাল ব্যবহার করে বলে এই নৌকাগুলো ‘নেটওয়ার্ক’ বলে পরিচিত। এই ইলিশ নৌকা জলে ভাসাতে খরচ পড়ে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। ৪ থেকে ৫জন লোক হলেই এই নৌকা চালানো যায়।

    এবার মৌসুম শুরুর পর এখনো পর্যন্ত জেলেপাড়ায় খোঁজ নিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, এবার ইলিশ পড়েছে কম। সরকারের খাতায় ইলিশ ভরা দেখালেও বহু জেলে এবং আড়তদারের খাতা এবার শূন্য। 

    এর কারণ কী? অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রথমত, এ বছর সমুদ্র থেকে ইলিশ খুব একটা নদীতে আসেনি। যেসব ট্রলার বড় বিনিয়োগ করে সমুদ্রে গিয়েছে তারা কিছু ইলিশ পেয়েছে কিন্ত এর নব্বইভাগই ছোট সাইজের। হাতে গোনা কয়েকটি ট্রলার ভাগ্যক্রমে বড় ইলিশের ঝাঁকে হানা দিয়ে কিছু বড় ইলিশ মেরেছে।  

    কিন্তু সমুদ্র মোহনা এবং নদীতে মাছ ধরেছে যারা তারা ইলিশ পেয়েছে খুব কম। সমুদ্র মোহনা আর নদীতেই জেলের সংখ্যা বেশি। দ্বিতীয়ত, আগের তুলনায় জেলের সংখ্যাও বেড়েছে। ফলে সরকারের খাতায় ইলিশ লক্ষ্য অর্জনের ইঙ্গিত দিলেও জেলের মুখে এবার হাসি ফোটেনি।

    ইলিশ বেড়েছে নাকি কমেছে?- সে হিসাব আছে অনেকের কাছেই। সরকারের খাতায় ইলিশ আহরণের হিসাব উর্ধ্বমূখী। জেলে-আড়তদারদের কেউ লাভে, কেউ লোকসানে, এভাবেই চলছে বছরের পর বছর। 

    আয়-ব্যয়ের এই হিসাব সবার কাছে থাকলেও ইলিশ ধরতে গিয়ে শূন্য হাতে ফেরা, নিখোঁজ কিংবা প্রাণ হারানো জেলেদের খবর রাখেন ক’জন? নিষেধাজ্ঞা আসে, আপাতত ফুরায় সমস্ত আয়োজন, কোলাহল থামে, মলিন মুখে বাড়ি ফিরে যায় বহু জেলে। আবার শুরু হয় তাদের সংকটের দিন। এই সংকট টিকে থাকার, সংসারে পরিবার নিয়ে দু’মুঠো খেয়ে-পরে বাঁচার।


    কাশেম হাওলাদার
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ