ঢাকা সোমবার, ০৩ অগাস্ট ২০২৬

Motobad news
শিরোনাম
  • বরিশালে দুর্গাসাগর দীঘি থেকে হরিণ চুরি, কেয়ারটেকার-প্রহরী গ্রেফতার কালবেলার সম্পাদককে ফুলেল শুভেচ্ছা বরিশালের চরকাউয়া থেকে ৬ রুটে বাস ধর্মঘট, ভোগান্তিতে যাত্রীরা বিএনপি নেত্রী নাসরীনের পিতাকে হাসপাতালে দেখতে গেলেন ‍এমপি মজিবর রহমান সরোয়ার  ২৩ লাখের চেক ডিজঅনার মামলায় সেই সাহেদের ১ বছরের কারাদণ্ড ৭০ টাকা বেড়ে বারো কেজি এলপিজির দাম হলো ১৫৯৮  সামাজিক মাধ্যমে কারাগারের ছবি-ভিডিও প্রচার, বরিশালসহ ৫০ কারারক্ষীকে তলব হামলার শিকার হতে পারে পুলিশের যানবাহন, সতর্কতা জারি করল সদর দপ্তর বরিশাল সিভিল সার্জন কার্যালয়ে তালা, ডা. মনিরুজ্জামানকে স্ট্যান্ড রিলিজ ভোরের সংবাদ বাহকের মুখে হাসি ফুটালো মানবিক সাজ্জাদ পারভেজ 
  • অবৈধ তালিকার সাথে মিলনেই বাস্তবের

    পরিবেশ দপ্তরকে ম্যানেজ করে গড়ে উঠছে অবৈধ ইটভাটা

    পরিবেশ দপ্তরকে ম্যানেজ করে গড়ে উঠছে অবৈধ ইটভাটা
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    বরিশাল জেলার আওতাধিন মুলাদী উপজেলা। নদী পার হয়ে মুলাদীর মীরগঞ্জ ঘাটে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে বিশাল এলাকাজুড়ে ছোয়া ব্রিক্স নামের ড্রাম-চিমনির একটি ইটভাটা। ভাটার আসপাশে কাঠের বিশাল স্তুপ। দিন-রাত ২৪ ঘন্টাই কাঠ পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে ইট।

    খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ‘ইটভাটার মালিক খোদ মুলাদী উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল হাসান মিঠু খান এবং স্থানীয় ইউপি সদস্য শামীম খান। প্রভাবশালী এই দুই নেতার প্রভাবে দীর্ঘ বছর ধরেই অবৈধ এই ইটভাটায় পরিবেশ দূষণ করে তৈরি হচ্ছে ইট।

    শুধু ছোয়া ব্রিক্সই নয়। বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলায় এভাবেই প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় গড়ে উঠছে অসংখ্য অবৈধ ইটভাটা। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী বিভাগের ছয় জেলায় বৈঠ ইটভাটার সংখ্যা ৪৯১টি। তবে অবৈধ ইটভাটার সঠিক তথ্য নেই এই দপ্তরের কাছে।

    পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, বরিশাল বিভাগে অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা মাত্র ২২৪টি। তবে ইটভাটা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিভাগে বৈধর থেকে দ্বিগুণেরও বেশি অবৈধ ইটভাটার সংখ্যা।

    এদিকে, ‘অবৈধ ইটভাটাগুলোতে তোয়াক্কা করা হচ্ছে না পরিবেশ আইনের। ইটভাটাগুলোতে প্রকাশেই পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। ফসলি জমি এবং নদীর মাটি কেটে ব্যবহার করা হচ্ছে ইট তৈরির কাজে। আবার বৈধ ইটভাটাগুলোতেও কয়লা সংকটের অজুহাতে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে।

    তবে ইটভাটাগুলোর আইন বিরোধী এমন কার্যক্রম মাথা ব্যাথার কারণ হচ্ছে না পরিবেশ অধিদপ্তরের। দেখা যাচ্ছে না তাদের জোড়ালো কোন অভিযান। চলতি মৌসুমে দুটি মাত্র মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেই থেমে গেছে দপ্তরটি।
    এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের রহস্যজনক ভ‚মিকা সচেতন মহলে যেমন প্রশ্নের জাল বুনেছে, তেমনি ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ এবং ফসলি জমির পরিমাণ।

    যদিও অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ অধিপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. আব্দুল হালিম। তার দাবি আইন প্রয়োগে যেভাবে কাজ করার প্রয়োজন জনবল সংকটের কারণে তা করা সম্ভব হচ্ছে না।

    তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, ‘কয়লার মূল্য বৃদ্ধি বা সংকট হলেও ইটভাটায় কাঠ পোড়ানোর কোন সুযোগ নেই। তাছাড়া জনবল সংকট থাকতেই পারে। কিন্তু সেটা কোন অজুহাত হতে পারে না। পরিবেশ অধিদপ্তর কোনভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবি সমিতি (বেলা) এর বরিশাল জেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট লিংকন বাইন।

    বরিশাল অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল জেলার আওতাধিন হিজলা উপজেলায় মোট ইটভাটার সংখ্যা মাত্র ১৯টি। যার মধ্যে পরিবেশের ছাত্রপত্র নেয়া ভাটার সংখ্যা মাত্র ১৩টি। ছাত্রপত্র বিহীন ইটভাটা মাত্র ৬টি। মোট ইটভাটার মধ্যে ১৪টি জিগজাকের মধ্যে একটি চলছে পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া।
    তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের এমন তথ্যের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বাস্তবে। 

    সরেজমিনে এই উপজেলায় ৫৬টি ইটভাটার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। যার প্রতিটিতেই পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। কয়লার চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যায়নি অধিকাংশ ইটভাটায়। দু-একটি ভাটায় নামমাত্র কয়লার স্তুপ দেখা গেলেও সেখানেও ইট তৈরিতে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ।

    হিজলা উপজেলার জিগজাক ইটভাটার মালিক ইয়াছিন মুন্সি বলেন, ‘ডলার সংকটের কারণে কয়লা আমদানী প্রায় বন্ধ। এ কারণে গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে কয়লার দাম বেড়েছে। গত বছরের শুরুতে যেই কয়লার টন ২১ হাজার ছিল, বর্তমানে তার মূল্য প্রতিটন প্রায় ২৫ হাজার টাকা। পরিবহন খরচসহ মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৭ হাজার টাকা। কিন্তু টাকা থাকলেও কয়লা পাওয়া যাচ্ছে না।

    তিনি বলেন, ‘ইন্ডিয়া থেকে কয়লা আসতে শুরু করেছে। আমি সুনামগঞ্জ এসেছি সাড়ে ৩ টন কয়লা কিনেছি। এদিয়ে প্রায় ১৫ লাখ ইট উৎপাদন করা যাবে। তবে এ দিয়ে চলতি মৌসুম যাবে না। পরবর্তীতে আবার কয়লা আনতে হবে। বর্তমানে ইট তৈরিতে যে পরিমাণ খরচ হচ্ছে তা বহন করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    অপরদিকে, বাবুগঞ্জ উপজেলার দোয়ারিকা-শিকারপুর ব্রিজে উঠতেই চোখে পড়ে দুই ইটভাটার চিত্র। অসংখ্য ইটভাটায় কয়লার পরিবর্তে পুড়ছে কাঠ। আবার কোন কোন ভাটায় নদী এবং ফসলি জমির মাটি কেটেই ইটভাটায় পোড়ানো হচ্ছে।

    পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবি সমিতি (বেলা) সূত্রে জানা গেছে, ‘বাবুগঞ্জের রহমতপুরে ইতিপূর্বে ১১টি ভাটা থাকলেও বর্তমানে তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪টি। অনূরূপভাবে বাকেরগঞ্জের কলসকাঠি ইউনিয়নে পূর্বে ২১টি থাকলেও বর্তমানে ৩২টির মতো ইটভাটা হয়েছে। এগুলো প্রকাশ্যেই পোড়ানো হচ্ছে কাঠ।

    সংগঠনটির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ‘ইতিপূর্বে অবৈধ ইটভাটা বন্ধে আদালতে মামলা করে সংগঠনটি। পরবর্তীতে আদালত থেকে ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত অবৈধ এবং ৮০-১২০ ফিটের অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি পরিবেশ অধিদপ্তরবেলা’র বরিশাল জেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট লিংকন বাইন বলেন, ‘ইটভাটা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। 

    অথচ প্রতি বছরই ইটভাটার সংখ্যা বাড়ছে। তার মধ্যে জিকজাগ দেখিয়ে ইটভাটার অনুমোদন নিয়ে ড্রাম-চিমনিতে কাঠ পোড়ানো হচ্ছে। দাম বৃদ্ধির অজুহাতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ পুড়ছে। কিন্তু সেদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর গুরুত্ব দিচ্ছে না।

    তিনি বলেন, ‘কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরির কারণে বন উজার হচ্ছে। ফসলি জমি, গাছপালা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। পরিবেশ মারাত্মভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। কিন্তু ছাড়াপত্র দেয়ার পরে তদারকির যে দায়িত্ব রয়েছে সেটা সঠিকভাবে পালন করছে না পরিবেশ দপ্তর। এটা তাদের ব্যর্থতা। তাদের নিরবতার পেছনে কোন স্বার্থ কাজ করছে কিনা ক্ষতিয়ে দেখা দরকার।

    পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ‘দপ্তরটির বরিশাল কার্যালয়ে ইটভাটা বন্ধের থেকে নতুন ইটভাটার অনুমোদন দেয়াই মূখ্য বিষয়। জনবলের দোহাই দিয়ে বাইরে কার্যক্রম পরিচালনা না করলেও দপ্তরে বসেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করেন এখানকার কর্মকর্তারা। এ ক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনও হয়ে থাকে বলে দাবি সূত্রটির।
    জানা গেছে, ‘গত বছরের ডিসেম্বর মাসেই ১৩টি নতুন করে ছাড়পত্র প্রদান করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। আর ২০২২ সালে মোট ছাড়পত্র প্রদান করা হয়েছে ৩৯২টি। কিন্তু অবৈধ ইটভাটা বন্ধে জোড়ালো কোন পদক্ষেপ নেই প্রতিষ্ঠানটির।

    ২০২২ সালে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ বা বিশেষ আদালত পরিচালিত হয়নি একটিও। হয়নি কোন রীট মামলাও। তবে গেলো বছরজুড়ে বরিশাল বিভাগে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে মাত্র ৬১টি। যার মধ্যে চলতি ইট তৈরির মৌসুমে মোবাইল কোর্ট করা হয়েছে মাত্র ২টি। এক বছরে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৬৭ লাখ ৭০ হাজার।

    অবৈধ ইটভাটার কয়েকজন মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ে টাকার বিনিময়ে সব কিছুই সম্ভব। টাকা দিলে বৈধ এবং অবৈধর পার্থক্য থাকে না। যারা ঠিকভাবে টাকা দেয় না, তাদেরকে ইটভাটা বন্ধের জন্য নোটিশ প্রদান করা হয়। কিন্তু পরে যোগাযোগ করলেই আবার সব ঠিক হয়ে যায়। 

    ইটভাটা প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক মো. আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমাদের জনবল সংকট। তার মধ্যেও আমরা চেষ্টা করছি অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার। এরিমধ্যে আমরা বাকেরগঞ্জে দুটি অভিযান করে একটিতে জরিমানা এবং একটি ইটভাটা বন্ধ করে দিয়েছি। আমাদের এই অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

    তিনি বলেন, ‘ইটভাটার সঙ্গে ক্ষমতাসীনরা জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু কে কোন ইটভাটার সাথ যুক্ত সেটা মুখ্য বিষয় নয়। ছাত্রপত্র ছাড়া অবৈধভাবে ইটভাটা চালানোর সুযোগ নেই। সে যেই হোক আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে মুলাদীতে অবৈধ ছোয়া ব্রিক্সে কাঠ পোড়ানো এবং ইটতৈরীর বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না, এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।


    এইচকেআর
    গুগল নিউজে (Google News) দৈনিক মতবাদে’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ