দুই বছরে ৮৮৪ দুর্ঘটনায় ৬২৯ প্রাণহানী

সড়কে মৃত্যুর মিছিল কিছুতেই থামছে না। দিনের পর দিন দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতিদিনই ঝরছে বহু তাজা প্রাণ। খালি হচ্ছে হাজারো মায়ের বুক। প্রিয়জন হারানোর কষ্টের কোনো বর্ণনা হয় না। যে হারায় কেবল সেই বোঝে। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে হাজার হাজার পরিবার পথে বসছে। সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ওপরই নয়, সমাজ জীবনেও পড়ছে। অদক্ষ চালক, মাদকাসক্ত চালকদের যানবাহন চালানো, লক্কর-ঝক্কর যানবাহন, ঢিলেঢালা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আগে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা, নিয়ম না মেনে ওভারটেকিং, যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো, পেছনের বাসকে সামনে আসতে না দেয়ার কারণে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে বলে মত প্রকাশ করেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের নেতারা।
অপরদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ওইসব যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে তাদের পক্ষ থেকে অভিযান ও প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বরিশাল বিভাগে মোট ৮৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২৯ জন নিহত হয়েছে। এতে আরো ১ হাজার ৩৩৭ জন আহত হয়েছে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ও বরিশাল বিআরটিএ’র বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের এক পরিসংখ্যানে এ তথ্য জানা গেছে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ২০২০ ও ২০২১ সালের পরিসংখ্যান সূত্রে জানা গেছে, বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি হয়েছে বরিশাল জেলায়। এই জেলায় ২৬৭ সড়ক দুর্ঘটনায় ২০৮ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ৭৭১ জন। এছাড়া ঝালকাঠিতে ৩৫ সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত ও আহত হয়েছে ৬৫ জন, পিরোজপুরে ৪৮ সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৭ জন নিহত ও আহত হয়েছেন ৪৫ জন, পটুয়াখালীতে ৯৯ সড়ক দুর্ঘটনায় ১০৪ জন নিহত ও আহত হয়েছে ১৪০ জন, বরগুনায় ৫০ সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৬ জন নিহত ও আহত হয়েছে ৮৭ জন, ভোলায় ৮০ সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৯ জন নিহত ও ১২৯ জন আহত হয়েছে। তবে এর সাথে মিল নেই বিআরটিএ’র হিসেবের।
সরকারি প্রতিষ্ঠানটির দু’বছরের তথ্যমতে, ২০২০ সাল এবং ২০২১ সালে বিভাগে ৭৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে মাত্র ৯২ জনের। এর মধ্যে জেলায় গত দুই বছরে ৩৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৩৮ ও আহত হয়েছেন ৪১ জন। বিআরটিএ’র জরিপ হয় পুলিশ, সিভিল সার্জন ও মামলার ভিত্তিতে। তাদের নিজস্ব তথ্য সংগ্রহের কোন ব্যবস্থা নেই। এ কারণে তাদের হতাহতের সংখ্যা কম আসে বলেও স্বীকার করেছেন বিআরটিএ’র কর্মকর্তারা। তাদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পেশাদার চালকদের ড্রাইভিং লাইন্সে নবায়নের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে গুরুত্ব পয়েন্টে জনসচেতনতামূলক পোস্টার সাটানোসহ বিভিন্ন কার্য্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
ওদিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মহাসড়কে থ্রি হুইলার, অটোরিকশা ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। যদিও সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ২০১৫ সালে দেশের ২২টি মহাসড়কে ওইসব যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। তবে ওই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ধীরগতি, অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আর মানবিকতায় সড়কে তাজা প্রাণ ঝরা রোধ করা যাচ্ছে না বলে মত প্রকাশ করেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের নেতারা।
জানা গেছে, সড়কে দুর্ঘটনা কমিয়ে নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে সারাদেশের মহাসড়কে থ্রি হুইলার, অটোরিকশা ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। প্রথম দফায় ২২টি মহাসড়ক নির্ধারণ করে দেয়া হয়। যার মধ্যে ঢাকা-মাওয়া-কাওড়াকান্দি-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়ক ছিল। ঢাকা থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত ৩১৭ কিমি মহাসড়কে সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে পাত্তা না দিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত থ্রি হুইলার ও মোটরচালিত রিকশা চলাচল করছে। ওইসব যানবাহন ছাড়াও মহাসড়কে দূরপাল্লার পরিবহন, ভারি মালবাহী ট্রাক, পিকআপ, লোকাল বাস, মোটরসাইকেল চলাচল করছে। আর দ্রুতগতির প্রতিযোগিতা তো থাকছেই। কখনো কখনো পুলিশের অভিযানের মুখে এগুলোর চলাচল সাময়িক বন্ধ থাকলেও অভিযান থেমে গেলে পরিস্থিতি ফিরছে আগের অবস্থায়। ফলে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ।
বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার মো. মারুফ হোসেন বলেন, সড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চলমান আছে। সূত্রমতে, জাতীয় মহাসড়কে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়কে ৬০ ও জেলা সড়কে ৪০ কিমির গতিবেগে গাড়ি চালানোর নিয়ম রয়েছে। কিন্তু চালকেরা এ নিয়মনীতির তোয়াক্কা করেন না।
হাইওয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের অংশের যা অবস্থা, তাতে কোনো অবস্থাতেই ৬০ কিমির বেশি গতিতে গাড়ি চালানো উচিত নয়। কিন্তু দূরপাল্লার গাড়িগুলো এখানে ১০০-১১০ কিমির গতিতে চলে। জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতা বলেন, ব্যবসার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনেকে বেশি গতিতে গাড়ি চালান। প্রতিনিয়ত চালকদের সঙ্গে সভা করে তারা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে নিষেধ করছেন। পাশাপাশি সড়কে নছিমন, করিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্রা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন যান চলে। এগুলোর চালকরা দক্ষ নন। এটাও দুর্ঘটনার বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক থ্রি হুইলার চালক জানান, লোকাল গণপরিবহনে যাতায়াতে সময় বেশি ব্যয় হওয়ায় যাত্রীরা সিএনজি, আলফা মাহিন্দ্রা ও অটোরিকশা ব্যবহার করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে তারা বলেন, পেটের তাগিদে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়েই তারা মহাসড়কে থ্রি হুইলার চালাচ্ছেন। এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা কারন হিসাবে মানুষের সচেতনার অভাবকে দায়ী করেছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ড.তারেক মাহামুদ আবির। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, সড়ক আইন যেমনি হচ্ছে না মানা, তেমনি সড়কে চলাচলে ডিভাইস সঠিক ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, দক্ষ চালক নেই বললেই চলে। সড়ক দুর্ঘটনাগুলো দক্ষ চালক না থাকার কারনেই বেশি হচ্ছে । সরকারের উচিৎ দ্রত করে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চালকদের ড্রাইভিং লাইন্সে বুঝিয়ে দেয়া, আর যাদের ড্রাইভিং লাইন্সে নেই তাদের চালক থেকে অব্যহতি দেয়া । তাহলেই সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসতে পারে বলেন তিনি। বরিশাল সচেতন নাগরিক (সনাক) এর সভাপতি প্রফেসর শাহ সাজেদা বলেন, প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত চালক নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, একটি পরিবহনে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত দু’ জন চালক থাকা দরকার। পাশাপশি আইনশৃখলা বাহিনীর কঠোর নজরধারি থাকা দরকার বলে আমি মনে করি। এতে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে আসতে পারে বলেন সনাক সভাপতি।
নিসচা কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম আজাদ হোসেন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা বিগত ২ বছরে অনেক বেড়েছে। অশিক্ষিত ও অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, রাস্তা নির্মাণে ত্রুটি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আইন ও তার যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া ইত্যাদি মূল কারণ বলে চিহ্নিত করা যায়। তিনি আরো বলেন, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ পুরোপুরি কার্যকরী না হওয়ায় সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে আরো সোচ্চার হওয়া ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে আমরা মনে করি।
বরিশাল বিআরটিএ’র বিভাগীয় উপ-পরিচালক (ইঞ্জিন) মো. জিয়াউর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে তার দফতরের নানা উদ্যোগের কথা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। যা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রতিনিয়ত বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জনসাধারণ এবং গাড়ির চালক, কন্ডাক্টর ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক পথসভা ছাড়াও লিফলেট বিতরণ করার কথা জানান তিনি। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এস এম তানভীর আরাফাত বলেন, মহাসড়কে থ্রি হুইলারের চলাচল সম্পূর্ণ অবৈধ। প্রতিনিয়ত এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোসহ আটক করে মামলা দেয়া হচ্ছে। সড়ক পারাপারের ক্ষেত্রে পথচারীরা একটু সচেতন হলে দুর্ঘটনা কমে আসবে। পাশাপাশি চালকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রচার প্রচারণাও চালানো হচ্ছে বলেন তিনি।
এমবি